
কালা পাহাড়ের মৃত্যু: ২০০৫ সালে প্রজনন ঋতুতে ভারতের মাদ্রাজ থেকে আনা অন্য একটি পুরুষ কুমিরের সঙ্গে মারামারি বা সংঘর্ষে বৃদ্ধ কালা পাহাড় গুরুতর জখম হয়। পরবর্তীতে চিকিৎসারত অবস্থায় ২০০৬ সালের ২৬ ফেব্রুয়ারি আদি কালা পাহাড় মারা যায়।ধলা পাহাড়ের মৃত্যু: কালা পাহাড়ের মৃত্যুর প্রায় এক দশক পর আদি স্ত্রী কুমির ‘ধলা পাহাড়’ বার্ধক্যজনিত কারণে দিঘির পাড়েই মারা যায়। এর মাধ্যমে খান জাহান আলীর আমলের আদি মিঠা পানির কুমির যুগলের ইতিহাসের সমাপ্তি ঘটে।আপনার ধারণাটি আংশিক সত্য এবং এর পেছনে ঐতিহাসিক ও বৈজ্ঞানিক কিছু সুনির্দিষ্ট কারণ রয়েছে।হযরত খান জাহান আলী (রহ.)-এর আদি কুমির 'কালাপাহাড়' ও 'ধলাপাহাড়' মানুষের প্রতি তুলনামূলক শান্ত স্বভাবের ছিল এবং তারা কখনো মানুষকে আক্রমণ করেনি। তবে সম্প্রতি যে কুমিরটি এক শিশুকে আক্রমণ করেছে, সেটি মূলত ২০০৫ সালে ভারতের মাদ্রাজ ক্রোকোডাইল ব্যাংক থেকে আনা মিঠাপানির কুমির। বন্য এবং উগ্র স্বভাবের হওয়ার কারণে এটি মাজারের দিঘিতে হিংস্র আচরণ শুরু করে।এই ঘটনার বিশদ বিবরণ নিচে আলোচনা করা হলো:
১. আদি কুমির ও বর্তমান পরিস্থিতিআদি কুমিরের স্বভাব: সুলতানি আমলে হযরত খান জাহান আলী (রহ.) দীঘি খনন করে যে একজোড়া মিঠাপানির কুমির ছেড়েছিলেন, লোকমুখে তারা 'কালাপাহাড়' ও 'ধলাপাহাড়' নামে পরিচিত। তারা এবং তাদের বংশধরেরা ভক্তদের দেওয়া খাবার খেয়ে অভ্যস্ত ছিল এবং দীর্ঘ ৬০০ বছরে মানুষের কোনো ক্ষতি করেনি।আদি বংশের সমাপ্তি: আদি কুমিরদের সর্বশেষ বংশধরটি ২০১৫ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে বার্ধক্যজনিত কারণে মারা যায়। ফলে আদি স্বভাবের কোনো কুমির এখন আর দীঘিতে নেই।
২. ভারত থেকে আনা কুমিরের আক্রমণাত্মক আচরণমাদ্রাজ থেকে আমদানি: দীঘি কুমিরশূন্য হয়ে যাওয়ার পর ঐতিহ্য রক্ষার্থে ২০০৫ সালে তৎকালীন সরকারের আমলে ভারতের চেন্নাইয়ের মাদ্রাজ ক্রোকোডাইল ব্যাংক থেকে ছয়টি মিঠাপানির কুমির এনে বাংলাদেশে ছাড়া হয়। এর মধ্য থেকে দুটি কুমির খান জাহান আলীর দীঘিতে অবমুক্ত করা হয়েছিল।হিংস্র স্বভাব ও দুর্ঘটনা: এই কুমিরগুলো খাঁচায় বা বন্য পরিবেশে বড় হওয়ায় মাজারের আদি কুমিরদের মতো মানুষের সাথে এদের সহাবস্থান গড়ে ওঠেনি। ফলস্বরূপ, সম্প্রতি (১ জুন, ২০২৬) এই কুমিরটি দীঘির মহিলা ঘাটে ফাতেমা নামের ৮ বছরের এক শিশুকে টেনে নিয়ে গিয়ে হত্যা করে। এর আগেও এটি দীঘির পাড়ে কুকুর এবং মানুষের ওপর একাধিকবার আক্রমণ করেছিল।
৩. প্রশাসনের বর্তমান পদক্ষেপকুমির অপসারণ: এই মর্মান্তিক শিশু মৃত্যুর ঘটনার পর, জননিরাপত্তার স্বার্থে বাগেরহাট জেলা প্রশাসন ও বন বিভাগ জরুরি সভা ডেকে দীঘির একমাত্র কুমিরটিকে সরিয়ে নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়।বর্তমান অবস্থান: ৩ জুন, ২০২৬ তারিখে বন বিভাগের বিশেষজ্ঞ দল খাবারের প্রলোভন দেখিয়ে প্রায় ৬০০ কেজি ওজনের এই মাদী কুমিরটিকে অক্ষত অবস্থায় উদ্ধার করে। বর্তমানে এটিকে পর্যবেক্ষণের জন্য খুলনার বন্যপ্রাণী উদ্ধার ও পুনর্বাসন কেন্দ্রে নিয়ে যাওয়া হয়েছে।ঐতিহাসিক ও স্থানীয়রা একমত যে, ভারতের মাদ্রাজ থেকে আনা এই কুমিরটি বন্য ও হিংস্র প্রকৃতির হওয়ার কারণেই দীঘির ৬০০ বছরের শান্ত পরিবেশ বিঘ্নিত হয়েছে এবং মানুষের জন্য তা বিপজ্জনক হয়ে উঠেছিল।
